অস্তিত্ব সংকটে কপোতাক্ষ: প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব ও অপরিকল্পিত খনন
দখনকৃত কপোতাক্ষ

অপরিকল্পিত বাঁধ আর স্রোতের গতিপথ বদলে যাওয়ার কারণে শুকিয়ে মৃতপ্রায় একসময়ের স্রোতস্বিনী কপোতাক্ষ নদ। একই সঙ্গে শুকিয়ে যাওয়া নদ দখলেও প্রভাবশালীদের প্রতিযোগিতা চলছে সমানতালে। কপোতাক্ষের বুকেই অবৈধভাবে দখলদারেরা স্কেভেটর মেশিনের সাহায্যে বড় বড় বাঁধ দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে মাছ চাষের জন্য প্রস্তুত করেছে। ফলে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হতে না পারলে অধিকাংশ গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে। কপোতাক্ষের অপরিকল্পিত খনন ও দখলদারিত্বের কারণে চলতি বর্ষা মৌসুমে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ পাড়ের হাজার হাজার মানুষকে অন্যান্য বছরের মত এবারও চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে। আশির দশকে যে নদে পাকা মাঝিরাও স্রোতের কাছে হার মানত, সে নদ মানুুুুুষের কাছে এখন স্মৃতি আর গল্প মাত্র।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানায়, জোয়ার-ভাটা প্রবাহ না থাকায় এবং মানুষের যথেচ্ছা ব্যবহারের কারণে এই নদের এক তৃতীয়াংশ আজ হারিয়ে গেছে। ফলে ধীরে ধীরে এই নদের ঐতিহ্য এখন আর নেই। এক সময়ের শস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত তালা উপজেলার হাজারো পরিবারের জীবনযাপনের মূল চালিকা শক্তি ছিল এই নদ। এ উপজেলার কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি নির্ভর করত এই প্রবাহমান নদের উপর। কিন্তু কালের পরিবর্তনে আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এলাকায় ধীরে ধীরে পানি সংকটের কারণে বসবাসরত মানুষের জন্য বিপর্যয় ধেয়ে আসছে।

এখানকার কৃষকরা জানান, নদ শুকিয়ে দু’পাড়ে জেগে উঠেছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। কিন্তু নদ বাঁচিয়ে রাখার কথা বিবেচনা না করে সেটেলমেন্টে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পন্থায় ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে অনেকেই এই নদকে নিজেদের জমিভুক্তি করে নিয়েছে। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত দখল হচ্ছে এক সময়ের ঐতিহ্যবাহি কপোতাক্ষ। এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ এলাকার প্রান্তিক চাষিরা। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে এখানকার সরকারি জলাশয়েরও হাতবদল হয়ে থাকে। মূলত এ কারণে নদ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয় না। ভূক্তভোগীরা বলেন, অবৈধভাবে দখলকৃত নদ যত দ্রুত সম্ভব দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করা হলে এ এলাকার কৃষি ও ব্যবসা বাণিজ্যে উন্নয়নে আরও প্রসার ঘটবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই নদ পুনঃখনন শুরু করা হলে ও পূর্বের ন্যায় এবারও চলছে ব্যাপক দুর্নীতি। ফলে এলাকার মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ থেকেই যাচ্ছে। উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের কাশীপুর সংলগ্ন কপোতাক্ষ নদে শুরু হয়েছে দখলের প্রতিযোগিতা। কপোতাক্ষের চর দখল করে স্কেভেটর মেশিন দিয়ে মাটি ভরাট করে মাছ চাষ শুরু হয়েছে। তালা সদর থেকে বারুইহাটি পর্যন্ত ও তালা থেকে শাহপুর বাজার পর্যন্ত পানি প্রবাহের একমাত্র খালটি দখল করার কারণে ওই এলাকার পানি আর কপোতাক্ষে পড়তে পারে না। এছাড়া তেঁতুলিয়া, কলিয়া, নোয়াপাড়া, লক্ষ্মণপুর সুভাষিনী, ইসলামকাঠি, কলাপোতা, তেরছি, মির্জাপুর, কুমিরা, শাঁকদহসহ ১২টি ইউনিয়নের অধিকাংশ বিলে বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ করার কারণে এই এলাকার বসবাসকারী মানুষেরা এবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়বেন।

২০০০ সালের ভারতের পানিতে সৃষ্ট বন্যার পর হতে কপোতাক্ষ নদের বুকে পলি জমে নাব্যতা হারাতে শুরু করে। প্রতিবছরই নাব্যতা হ্রাস এতই বৃদ্ধি পায় যে কপোতাক্ষ অববাহিকার তিন জেলার ৯টি উপজেলার ১ হাজারেরও বেশি গ্রামের ১০ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে বর্ষা মৌসুম হতে ৮ মাস মানবেতর জীবন যাপন করেন। এ সময় শত শত একর ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। কপোতাক্ষ খননের জন্য মহাজোট সরকার ২০১১ সালে ৪ বছর মেয়াদে ২শ ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করেন। একদিকে চলছে অপরিকল্পিত খনন কাজ অপর দিকে চলছে পাল্লা দিয়ে কপোতাক্ষ দখলের পালা।

সরেজমিনে তালা উপজেলার কপোতাক্ষ তীরবর্তী কাশিপুর, সরুলিয়া, সারসা, কুটিঘাটা নামক স্থানে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও কপোতাক্ষের মাঝে আড়াআড়ি ভেড়ী বাঁধ দিয়ে মৎস্য ঘের করা হচ্ছে। আবার কোথাও কপোতাক্ষের বক্ষে বাঁধ দিয়ে গ্রাম রক্ষার নামে হচ্ছে ভেড়ী। সারসা এলাকায় একাধিক গ্রামবাসী জানায়, কুটিঘাটা নামক স্থানে কাদের মোল্যা, ইয়াকুব মুন্সি নদীর সীমানায় বাঁধ দিয়ে মৎস্য ঘের করছে। এছাড়া তালা উপজেলার ঘোষনগর হতে বগার খাল পর্যন্ত কপোতাক্ষের উভয় পাশে এবং কাশীপুর হতে উত্তর সারসা সীমানা অনুযায়ী জেগে ওঠা চর দখল করে ভেঁড়ীবাধ দিয়ে চলছে মৎস্য চাষ। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে এ সকল ভেড়ীবাধ ও মৎস্য ঘের পানি প্রবাহে নানান অসুবিধার সৃষ্টি করবে। তাছাড়া কপোতাক্ষের দু’ধারে মাটি ভরাট করে বাড়িঘর ও দোকানপাট নির্মাণ করে অনেকে অবৈধভাবে দখল করে চলেছে। কপোতাক্ষের বুকে শুষ্ক মৌসুমে সবুজ ফসলের মাঠ আর বর্ষা মৌসুমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা এটাই কপোতাক্ষ দু’পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের এক সময়ের দুগ্ধ ¯্রােতরূপী কপোতাক্ষ নদ অবৈধ দখলদারদের লোলুপ দৃষ্টির বাস্তবায়নের ফলে জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে উপনীত।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের এমপি এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ জানান, কপোতাক্ষের ভেড়িবাঁধ বা নদের বুকে মৎস্য ঘের করলে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধিকতার সৃষ্টি হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কপোতাক্ষ নদের জমি কপোতাক্ষ নদেই থাকবে। যদি কেউ এটা দখল করার চেষ্টা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।