মণিরামপুরের হারমোনিয়াম সুর ছড়াচ্ছে সারাদেশে ॥ চাহিদা থাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র কারখানা
হারমনিয়াম তৈরীতে ব্যস্ত এক কারীগর

যশোরের মনিরামপুরের হারমোনিয়াম ছড়িয়ে যাচ্ছে সারাদেশে। এই হারমোনিয়ামের সুরের মুর্ছনায় বিমোহিত হচ্ছেন শ্রোতারা। তাই শিল্পির সাধণায় আর সঙ্গীতপিপাসুদের মনের খোরাক জোগাতে হারমোনিয়াম সরবরাহের জন্য এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি কারখানা।

হারমনিয়ামের কারিগররা জানান, গানের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতাদের সুরের মূর্ছনায় বিমোহিত করে রাখার প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে বাদ্যযন্ত্র। বাদ্যযন্ত্রকে ৪ ভাগে ভাগ করা হয়। তারের যাবতীয় যন্ত্রকে তত বাদ্যযন্ত্র, শ্বাস বা হাওয়ার সাহায্যে বাদিত যন্ত্রকে সুষির, চামড়ায় আচ্ছাদিত যন্ত্রকে আনদ্ধ ও ধাতব বা কাঠ দ্বারা নির্মিত যন্ত্রকে ঘন বাদ্যযন্ত্র বলে। হারমোনিয়াম হলো সুষির বাদ্যযন্ত্রের শ্রেণিভূক্ত। একজন সঙ্গীত শিক্ষার্থীর সর্ব প্রথম প্রয়োজন হয় হারমোনিয়ামের। সঙ্গীত বিশরদদের মতে, হারমোনিয়ামের আদি বাস ছিল পাশ্চাত্যে। কথিত আছে ১৮৪০ সালে আরেকজান্ডার ডিবেইন নামে প্যারিসের এক সঙ্গীতানুরাগী এই যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন। অষ্টাদশ শতাব্দির দিকে পাশ্চাত্যের সঙ্গীত শিল্পীদের ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনের সাথে এ যন্ত্রটিরও আগমন ঘটে। কন্ঠ সঙ্গীতের পরেই যন্ত্র সঙ্গীতের আবির্ভাব। মধ্যযুগীয় মোঘল দরবারে গায়কদের আসন বাদকদের আসনের অগ্রভাগে ছিল। আজ আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় কঠিতর কাজ মানুষকে সহজ করে দিয়েছে, গোটা পৃথিবী আজ যেমন বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে, ঠিক তেমনি বিজ্ঞানের ছোঁয়া লেগেছে সঙ্গীত ভুবনেও। ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম সঙ্গীত ভুবনে এনে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। কিন্তু এরপরও আবহমান কাল ধরে সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে হারমোনিয়ামের রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। সঙ্গীত শিক্ষার ক্ষেত্রে হারমোনিয়ামের গুরুত্ব অপরসীম। আর এ কারণে এখনো গানের জগতে গায়কিদের কাছে হারমোনিয়ামের কদর থাকায় বাজারে এর চাহিদাও রয়েছে বেশ। তবে এর জন্য রয়েছে নানা ধরনের ক্রেতা। ক্রেতাদের চাহিদায় মণিরামপুরে গড়ে উঠেছে ৪/৫টি বাদ্যযন্ত্র তৈরীর ঘর। যেখানে সুদক্ষ কারিগর তার মননশীল চিন্তাধারায় হাতের নিপুন ছোঁয়ায় তৈরী করে চলেছেন হারমোনিয়াম। কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় হারমোনিয়াম তৈরীতে ব্যস্ত কারিগর আইয়ুব খাঁ ও তার সহযোগী বরুন মজুমদারের সাথে। বংশপরম্পরায় প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি হারমোনিয়াম তৈরীর পেশার সাথে জড়িত। আইয়ুব খাঁ জানান, এ উপজেলার পার্শ্ববর্তী অভয়নগর, কেশবপুরসহ অন্য উপজেলাতে ১টি করে হারমোনিয়াম তৈরীর কারখানা থাকলেও এখানকার তৈরীকৃত হারমোনিয়ামের চাহিদা ক্রেতাদের কাছে বেশী। এ জন্য মণিরামপুরে কয়েকটি হারমোনিয়াম তৈরীর কারখানা গড়ে উঠেছে। সিঙ্গেল বেলো, ভাঁজ বেলো, কাপলার, স্কেল চেঞ্জার, টেবিল, বক্স, বাবলারসহ কয়েক রকমের হারমোনিয়াম থাকলেও এখানে প্লেন চাবি, স্টিক চাবি, চেঞ্জার ও বাবলার জাতীয় হারমোনিয়ামের চাহিদা বেশী। একটি হারমোনিয়াম তৈরীতে সাধারণত কাঠ, পিতলের রিড, স্টিলের রিং, পিতলের তার, কাঠের পর্দা, পীস বোর্ড, মার্বেল পেপার, সেলুলয়েড, ওয়াসার, কব্জা, স্ক্রু, হাতল, শিরিষ আঠা, প্লাস্টিক বা কাঠের তৈরী ছোট-বড় আকারের গোল স্টপারের বোলা, বার্নিশের দ্রব্যাদিসহ আরো বহুবিধ উপকরণের প্রয়োজন হয়। একটি হারমোনিয়াম তৈরী করতে ৬/৭দিন সময় লাগে। তিনি আরো জানান, হারমোনিয়ামের কাঠামো অনুসারে পারিশ্রমিক বাবদ প্রতিটি থেকে তিনি ১৫’শ টাকা থেকে ৪’হাজার টাকা এবং তার সহযোগী ১হাজার থেকে ৩হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। প্রতি মাসে এ ধরনের ৬/৭টি হারমোনিয়াম তৈরী করতে পারেন বলেও তিনি জানায়। মালিক দেবব্রত চক্রবর্তী জানান, একটি সাধারণ মানের হারমোনিয়াম তৈরী করতে ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, যা ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া এখানকার তৈরি হারমোনিয়াম দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। তবে, যেভাবে হারমোনিয়াম তৈরীর উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে খরচ পুষিয়ে লাভের মুখ দেখা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। আর তাহলে আস্তে আস্তে এ যন্ত্রের ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।