যশোরের এতিহ্যবাহী চিরুনিকল এখন শুধু স্মৃতি
২শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের চিরুনির মেশিনের অবশিষ্ট

এক সময় যশোর নামের সাথে জড়িয়ে ছিলো চিরুনির ঐতিহ্য। উপমহাদেশের ললনাদের মেঘবরণ চুলোর কেশ চর্চায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো যশোরের চিরুনি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এক সময় এই চিরুনির সাড়া জাগানো সুনাম ছিলো অখন্ড ভারত উপমাদেশ জুড়ে। সে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল শ্রীলঙ্কা, মিশরসহ সমগ্র আরব বিশ্বে। বলতে গেলে উপমহাদেশের বাজার তখন ঝুঁকে পড়েছিলো যশোরের চিরুনির দিকে। যশোরের সেই বিক্ষাত্য ২শ বছরের ঐতিহ্য যশোর চার খাম্বার মোড়ের চিরুনি কলের শেষ ম্মৃতিও নিশ্বেস করে দিচ্ছে কল মালিকরা।


সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় যশোর শহরের চারখাম্বার মোড় এলাকায় বিশাল জায়গা জুড়ে ছিল চিরুনি কল। যদিও অনেক দিন ধরে চিরুনিকলটি অকেজো পড়ে ছিল, তারপরও ২শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের শেষ স্মৃতি টুকুও উপড়ে ফেলা হয়েছে । চিরুনি তৈরির সেই বড় বড় লোহার মেশিন গুলো আজও দাড়িয়ে আছে স্বগৌরবে। যশোরের চিরুনি শিল্প আজ হারিয়ে গেছে। হাজারো রকমের সমস্যর কারনে এক সময় বন্ধ হয়েযায় চিরুনি কল গুলো। কিন্তু তার পরও আমাদের নতুন প্রজন্ম যশোরের জবু থবু চিরুনিকলটি দেখে চিরুনির হারানো ঐতিহ্যের কথা মনে করত। কিন্তু যশোরেরে চিরুনির সেই শেষ স্মৃতিটিও আজ হারিয়ে গেল কালের গর্ভে। উল্লেখ্য চিরুনির কাঁচামাল তথা সেলুলয়েডের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং চোরাপথে আনা ভারতীয় চিরুনি এই শিল্পের নড়বড়ে ভিতকে আরো নড়িয়ে দেয়।

উল্লেখ করার মত কথা যে বৃটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জনকে উপহার দেয়া হয়েছিল যশোরের চিরুনি। অভিভুত হয়ে তিনি বলেছিলেন হাউ ওযান্ডারফুল, ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ তাঁর মেয়ের নামে চিরুনির নামকরণ করা হয়েছিলো ‘ইকলিস’। চিরুনি উপহার দেয়া হয়েছিলো তৎকালিন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী জনাব আরিফকে। দেয়া হয়েছিলো ইরান, রাশিয়া, জাপান, ইতালী, বৃটেন ও তুরস্কের রাষ্ট্রদূতদের। তাঁর সকলে এর উচ্ছসিত পশংসা করেছিলেন।

শুরুর কথা:

১৯০১ সালে ‘কম্বস এন্ড সেলুলয়েড ওয়ার্কস’ নাম দিয়ে চিরুনি শিল্পের যাত্রা শুরু মাত্র ৪০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে শ্রী কিরণ দত্ত, মন্মথ বাবু এবং শ্রী মিত্র এ কাজে হাত দেন । এদের মধ্যে মন্মথ বাবু চিরুনি শিল্পে জাপান থেকে প্রশিক্ষন নিয়েছিলেন। পরবর্তী কালে বৃটিশ ও পাকিস্থান আমল মিলিয়ে আরো তিনটি চিরুনি কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলো হলো: যশোর কম্ব ওয়ার্কস’, যশোর কম্ব এন্ড নভেলটি ওয়ার্কস, শফি যশোর কম্ব ফ্যাক্টরি’। ১৯৭২ সালে ‘মিতা যশোর কম্ব ফ্যাক্টরী নামে আরো একটি কল গড়ে ওঠে।

শুরু থেকে যশোরের চিরুনির সুনাম আস্তে আস্তে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তবে ১৯৩০ সালে থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ‘কম্বস এন্ড সেলুলয়েড ওয়ার্কস’ এর তৈরি চিরুনির চাহিদা ছিলো সর্বাধিক। তখন দৈনিক পঁচিশ হাজার চিরুনি এই কারখানায় তৈরি হতো। এই সময়ে মহীশূর, কোলকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বে, হায়দরাবাদ, কানপুর, লাহোর, দিল্লী, করাচী, লাক্ষ্ণৌ, আহমেদাবাদ, মিরাট, পুনে, বরোদা, পাটনা সহ বলতে গেলে প্রায় সারা ভারত জুড়েই চলতে থাকে প্রদর্শনী। আসতে থাকে একেরপর এক স্বর্ণপদক। বিদেশের বাজারও তখন যশোরের চিরুনির জন্য ছিলো উদগ্রীব।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কিরণ দত্ত, মন্মথ বাবু ও শ্রী মিত্র ভারতে চলে যান। ফলে যশোরের চিরুনি শিল্প প্রথমবারের মতো অনিশ্চয়তার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। তখন এম এম আলমগীর, জে. এম আকবর ও শেখ সফিউদ্দিন এই তিনজন পর্যয়ক্রমে চিরুনি শিল্পের হাল ধরেন। ফলে সাময়িক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।

১৯৮২ সালে খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক আচার্য প্রফুল্ল রায় এসেছিলেন যশেরের চিরুনি শিল্প পরিদর্শনে। সন্তুষ্ট হয়ে তিনি অভিজ্ঞান পত্র দিয়েছিলেন। শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরুপ তাকেও চিরুনি উপহার দেওয়া হয়েছিলো। এই শিল্প পরিদর্শনে ১৯৫৯ সালে রাশিয়া, ১৯৬২ সালে সুইডেন, বৃটেন ও ইরান, ১৯৭০ সালে ইতালী, ১৯৭৬ সালে পোল্যন্ড প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রদূতগণ এসেছিলেন। এছাড়াও পরিদর্শনে এসেছিলেন জাপানের কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা এবং বহু দেশি-বিদেশি গন্যমান্য ব্যক্তি।