অরক্ষিত বিলুপ্তপ্রায় হনুমান
বিলুপ্তপ্রায় কালোমুখো হনুমান

যশোরের কেশবপুর উপজেলার বিলুপ্তপ্রায় হনুমানগুলো সুরক্ষায় কোনো গতি হলো না। প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। যে কারণে খাদ্যের জন্য প্রতিনিয়ত এসব হনুমান মানুষের বাড়িতে, ফসলের ক্ষেতে হানা দিচ্ছে। ফলে এক সময় যে হনুমানগুলোর সঙ্গে কেশবপুরের মানুষের মধুর সম্পর্ক ছিল, সেই সম্পর্ক এখন সাপে-নেউলেতে রূপ নিচ্ছে।


বিশ্বে যে কয়টি প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার দৌড়ে সামনের সারিতে রয়েছে, তার মধ্যে কেশবপুরের এ হনুমান অন্যতম। ভবঘুরে স্বভাবের কালো মুখের এ হনুমান কেশবপুর ছাড়াও ভারত, নেপাল, সিকিম, কাশ্মীর, তিব্বত ও শ্রীলঙ্কাতেও এদের অস্তিত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে কেবল কেশবপুরেই এর অস্তিত্ব রয়েছে। এদের রক্ষায় স্থানীয় লোকজন মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেও সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। খাদ্য নিরাপত্তা না থাকায় প্রতিনিয়ত দলছুট হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে যশোরের কেশবপুরের হনুমান। প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা পড়ছে তারা। সকাল-বিকাল খাদ্যের সন্ধানে ছোটাছুটি করছে হনুমানের দল- এ দৃশ্য যশোরের কেশবপুরবাসীর কাছে নিত্যকার। দুপুরে কোনো বাগান অথবা বড় কোনো গাছে বিশ্রাম নেয় তারা। বাচ্চাসহ একেকটি হনুমান গাছের ডাল থেকে ডালে ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত লাফাতে পারে। কেশবপুর শহর ছাড়াও পাশ্র্ববর্তী ভোগতী, নরেন্দ্রপুর মধ্যকুল, বালিয়াডাঙ্গা, ব্রহ্মকাটি, আলতাপোল, সুজাপুর, রামচন্দ্রপুর, ভবানীপুর এদের বিচরণক্ষেত্র। বিভিন্ন গাছের কচিপাতা, ফুল, ফল, ক্ষেতের ফসল এরা খেয়ে থাকে। ফলের মধ্যে পাকা কলা, আম, কাঁঠাল হনুমানের খুবই প্রিয়। ক্ষেতের মটরশুঁটি, বেগুনসহ নানা ধরণের সবজিও এরা খেয়ে থাকে। হনুমানগুলো সাধারণত দলবদ্ধভাবে চলাচল করে। একেকটি দলে ১০-১৫টি থেকে শুরু করে ৭০-৮০টি পর্যন্ত হনুমান থাকে। একটি পুরুষ হনুমানের নেতৃত্বে হনুমানের দল খাবারের সন্ধানে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত চলাচল করে।


কেশবপুরে এখন হনুমানের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা কেউ বলতে পারেন না। এমনকি বন বিভাগের কাছেও নেই এ হিসাব। সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বহু বছর আগে একবার গণনা করা হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে হনুমানের সংখ্যা গণনা করা হয়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগেও কেশবপুরে ৫ থেকে ৬ হাজার হনুমান ছিল। এখন এর সংখ্যা ৫-৬শতে নেমে এসেছে। প্রাণিবিজ্ঞানের অধ্যাপক অসিত বরণ ভৌমিক বলেন, চারপাশে নগর সভ্যতার বিকাশ হতে থাকায় হনুমানের বিচরণক্ষেত্র আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তিনি বলেন, যে কোনো প্রাণীর প্রজননের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশও প্রয়োজন। এসব না থাকলে মনে শান্তিও থাকে না, প্রজননও ঠিকমতো হয় না। সে কারণেই হনুমানের বংশবৃদ্ধি যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি খাদ্যের সন্ধানে তারা কেশবপুর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। খাবারের অভাবে দোকানে ঝোলানো রুটি, কেক, কলা ছিনিয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলছে হনুমানের দল। বাজার ফেরত মানুষের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের ব্যাগ কেড়ে নিয়ে সবজি খেয়ে ফেলছে। এতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে হনুমানের সম্পর্কেরও অবনতি হচ্ছে। কেশবপুর উপজেলার চেয়ারম্যান আমীর হোসেন বলেন, সরকারিভাবে সামান্য কিছু খাবার হনুমানদের দেওয়া হয়। স্থায়ী জায়গা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।