মঙ্গল শোভাযাত্রা-যশোর থেকে সারা দেশে
পহেলা বৈশাখের সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রায় নানা মুখোশ নিয়ে অংশ নেই শত শত মানুষ।
ছবিটি যশোর চৌরাস্তা মোড় থেকে তোলা। এহসান-উদ-দৌলা, যশোর।

রঙ-বেরঙের প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ছে। মুখোশ পরে নেচে গেয়ে বেড়াচ্ছে বর্ণিল পোশাকের তরুণ-তরুণীরা। বাজে ঢাক, কাঁসর, ঢোল। আজ থেকে ২৮ বছর আগের এক দৃশ্য। বাংলা নববর্ষে এভাবেই প্রথম যশোর শহরে বের হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। এরপর তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয় নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা।

যশোরের চারুপীঠ নামের একটি সংগঠ ন ১৯৮৫ সালে প্রথম বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে। এর উদ্যোক্তা ছিলেন চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা তরুণ শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম, হিরন্ময় চন্দ, ছোট শামীমসহ কয়েকজন। এর আগে এই উপমহাদেশে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শোভাযাত্রার কোনো ইতিহাস নেই। চারুপীঠের পর ১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করেন। ১৯৯০ সালে বরিশাল ও ময়মনসিংহ শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এর চার বছর পর ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও শহরে ও শান্তিনিকেতনে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। গত কয়েক বছর ধরে নববর্ষ উপলক্ষে দেশব্যাপী মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, ১৯৮৫ সালে যশোরের চারুপীঠের শামীম ও হীরন্ময় চন্দের উদ্যোগে প্রথম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সাজগোজ করে শোভাযাত্রা বের করা হয়। চারুকলা ইনস্টিটিউট ও চারুশিল্পী সংসদের উদ্যোগে আমরা ১৯৮৯ সালে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করি। তবে যশোরের চারুপীঠ এ ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। তাদের চেতনা থেকেই আমরা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শোভাযাত্রা শুরু করি।

প্রথম শোভাযাত্রার স্মৃতিচারণ করে শিল্পী শামীম বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা থেকেই আমরা ওই সময় নববর্ষ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করি। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে অংশ নিয়ে আমরা শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আমার চিন্তা হয়, ভাষাতো হলে; কিন্তু আমাদের কৃষ্টি, ইতিহাস ঐতিহ্য কই? বাঙালি হতে গেলে আরো কিছু করা দরকার। এই চিন্তা থেকে আমি শিল্পী হিরন্ময় চন্দ ও ছোট শামীম মিলে সিদ্ধান্ত নিই বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করব। এক মাস আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করি। ছোট শামীম প্রজাপতি, পাখি তৈরি করে। হিরন্ময় চন্দ তৈরি করে মুকুট। চারুপীঠের ৩০০ শিক্ষার্থীকে আমরা নাচ গানের প্রশিক্ষণ দিই। কেমন পোশাক হবে তাও ঠিক করি। এরপর যশোর সাহিত্য পরিষদের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আমরা ১৯৮৬ সালে বাংলা ১৩৯২ বর্ষবরণ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করি। ঢাক, ঢোল, সানাই বাজনাসহ বর্ণাঢ্য সেই শোভাযাত্রা এম এম কলেজের পুরাতন ছাত্রাবাস চারুপীঠ কার্যালয় থেকে শুরু হয়। এরপর দড়াটানা, বড়বাজার, চৌরাস্তা, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড হয়ে ফের চারুপীঠে এসে ওই শোভাযাত্রাটি শেষ হয়'

শামীম আরো বলেন, পরবর্তীতে আমরা চারুকলার ছাত্ররা মিলে ১৯৮৯ সালে প্রথম ঢাকায় শোভাযাত্রা বের করি। বরিশাল, ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৯০ সালে যে শোভাযাত্রা বের হয়, সেখানেও চারুকলার ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যশোর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি হারুন-অর-রশীদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের এই শহর সংস্কৃতির উর্বরভূমি। বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের অনেক কিছুর সঙ্গেই আমরা যুক্ত। যশোরে নববর্ষের প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমিও অংশগ্রহণ করি। পরবর্তীতে যশোর থেকে তা সারা দেশে ছড়িয়ে গিয়ে প্রতিটি বাঙালির শোভাযাত্রায় পরিণত হয়। এ জন্য আমরা গর্ব অনুভব করি।