দক্ষিণাঞ্চলের মেলা
মেলার পসরা সাজানো মিষ্টি-মিঠায়

সন্যাসীকে খালি গায়ে মাটিতে শোয়ানো হল। এরপর আঙুলের মত মোটা একটি বড়শি তাঁর পিঠে ফুটিয়ে দিলেন সন্যাসীদের প্রধান। বড়শি ফুটিয়ে সেই বড়শি গামছা দিয়ে বেঁধে সন্যাসীকে চড়ক গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হল। সন্যাসী শুন্যের উপর চড়ক গাছে ঘুরলেন। ছিটিয়ে দেয়া হল বাতাসা। আর চড়ক গাছে ঘোরার এই দৃশ্য উপভোগ করলেন হাজার হাজার মানুষ। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কপোতাক্ষ নদের কিনারে এই চড়ক উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ভারত থেকে হাজার হাজার মানুষ আসে। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ এই চড়ক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দু’শ বছর ধরে ফতেপুরের চড়ক মেলা বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের পালে বাতাস দিচ্ছে। আগে নৌকায় ভেসে মেলার সামগ্রী নিয়ে দূর দূরান্ত থেকে নানা পেশার মানুষ এসেছে। এখন নসিমন, আলমসাধু, বাস-ট্রাকে চেপে মেলায় আসতে হয়। কপোতাক্ষ এখন মৃত। নদী মরে যাওয়ার কারণে মেলার অস্তিত্ব হুমকির মুখোমুখি। ফতেপুরের চড়ক মেলার মত অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বাংলা নববর্ষের বৈশাখী মেলা ও চৈত্র্য সংক্রান্তির একশটি মেলা অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বাগেরহাটের কাড়াপাড়ার চৈত্র সংক্রান্তি মেলা, খুলনার শান্তিধামের বৈশাখি মেলা, বাগেরহাটের কচুয়ার চরবানিয়ারি ও দেপাড়ার বৈশাখি মেলা, খুলনা দৌলতপুরের পানি গাতির চৈত্র পূর্ণিমার সামান্দার মেলা, কপিলমুনির সপ্তাহব্যাপি চৈত্র সংক্রান্তির বারণী মেলা, মোড়লগঞ্জের লক্ষীখালির চৈত্র সংক্রান্তি মেলা, মোল্লারহাটের গংগাচন্নার তিনদিনের বৈশাখী মহা উৎসবের মেলা, খুলনার তেরখাদার দুরামার বৈশাখী মেলা, মাগুরার শ্রীপুরের বড়ালদি বৈশাখি মেলা, যশোরের চাঁচড়ার চৈত্র সংক্রান্তির খেজুর ভাঙ্গা মেলা, শেখহাটির চড়ক মেলা, ঝিনাইদহের মহেশপুরের ফতেপুর চড়ক মেলা, কালীগঞ্জের মল্লিকপুরের চৈত্র সংক্রান্তি মেলা। এছাড়া বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণ উৎসবের বাইরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলা, সাগরদাঁড়ির মধুমেলা, কুষ্টিয়ার লালন মেলা, নড়াইলের সুলতান মেলা, সুন্দরবনের দুবলার চরে রাস মেলা, বাগেরহাটের খাঁন জাহান আলী দরগা মেলা, মাগুরার মোহাম্মদ পুরের ঘোড়া দৌড়ের মেলা, চৌগাছার বুলু দেওয়ানের মেলা, কালীগঞ্জের গাজী কালু চম্পার মেলাসহ আরো কয়েকটি মেলা। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের বাঙালির সম্মিলন ঘটে ঐসব মেলায়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ওই সব মেলায় মাটির গন্ধ পাওয়া যায় না। বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য সাংস্কৃতি ছাপিয়ে মেলায় মাইকে বেজে ওঠে হিন্দি সিনেমার গান। আমরা আরো লক্ষ্য করছি, মোবাইল, গাড়ি, যন্ত্রপাতি, সাবান সোডা, সয়াবিন, ভৈজ্য তেল কোম্পানি মেলার চরিত্র নষ্ট করে দিচ্ছে। যার সঙ্গে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের কোন সম্পৃক্ততা নেই। মেলাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যেমন নদীকে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, তেমনি গৌরবময় বাঙালির মেলার আয়োজনকে সমৃদ্ধ করার জন্য সকলকে এগিয়ে আসা দরকার। আমাদের মেলার পণ্য সামগ্রী কৃষি পণ্য, কুটির শিল্প, হাতে বোনা তাঁতির সুনিপণ বস্ত্র, কামারের কাস্তে কোদাল, কুমারের মাটির তৈজসসহ দেশিয় পণ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেলার সেই মিষ্টি মিঠিাই, মেলার সেই পুতুল নাচ, যাত্রার বিবেক, গরু ঘোড়ার দৌড়, ফিরিয়ে আনা হলে বাঙালি অবশ্যই বাঙালি হয়ে উঠেবে।

আজ থেকে ৪৫৮ বছর আগে সম্রাট আকবর তার শাসন কাজ সুচারুভাবে পরিচালনার জন্যে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সন তারিখের প্রবর্তন করেছিলেন। এরপর থেকেই কৃষি কাজ, উৎসব অনুষ্ঠান, পালা পার্বন, হিসাব নিকাশ, হালখাতা, ব্যবসা বাণিজ্য, কর্মসংস্থানসহ জীবন জীবিকার সমস্ত বিষয় এই দেশের মানুষ বাংলা সনকে সামনে রেখে করে আসছে। আর এই বাংলা সনকে বিদায় ও স্বাগত জানানোর জন্যেই আয়োজন করা হয় মেলার। মেলা বাঙালির জীবন যাত্রার জিয়নকাঠি। সমাজের সব শ্রেণী পেশার মানুষের মিলন, কৃষি পণ্য, কুটির শিল্প, সৃজনশীলতা, আনন্দ, উৎসব, বিনোদন ছাড়াও জীবনের নানা অনুসঙ্গ মেলাকে প্রাণবন্ত করেছে। দক্ষিণের ৩ শতাধিক মেলা এই অঞ্চলের মানুষের আনন্দ উৎসবকে দীর্ঘদিন ধরে লালন করেছে। কিন্তু নদীর মৃত্যু, সন্ত্রাস, মাদকের ছোবল, মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, নষ্ট রাজনীতি, অন্ধকার ভিলেজ পলিটিক্স, অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বর্ষ বরণ ও বর্ষ বিদায়ের মেলাকে গিলে খেয়েছে। হারিয়ে গেছে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন মৃত্যু, লড়াই সংগ্রামের আনন্দ বেদনার সেই আড়ং। এই সব অস্থিরতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে দক্ষিণের প্রায় ২০০টি মেলা হারিয়ে গেছে। বাকি ১০০টি মেলা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে। মেলার খোলস পাল্টে গেছে। হারিয়ে গেছে মেলার বিনোদন জারি, সারি গান, পুঁথি পাঠ , যাত্রা, পুতুল নাচ, ভাঁটিয়ালি, পল্লীগীতি, ভাওইয়া, পটগান, গাতার গান, বিয়ের গানসহ বাঙালির মূল সুর। হারিয়ে গেছে মেলার পণ্য মাটির পুতুল, কুমার গৃহবধূর হাতে তৈরী মাটির তৈজস, লাঙল, গরুর গাড়ির চাকা, কাস্তে কোদাল, সাবল, দা, খোনতা, বাঁশ বেতের তৈরী গৃহস্থালির পণ্য, তাঁতে তৈরী গামছা, শাড়ি, লুঙ্গি, মাছ ধরার যন্ত্র ঘুনি, চারো, আরিমদে, দুড়ে, খালোই, তাল পাতার বাঁশি, রেশমী চুড়ি, হারমোনিয়াম বাঁশি, পুথির মালা, পুঁথি, আলতা। হারিয়ে গেছে মেলার মিষ্টি রাজভোগ, লেডিকিনি, দানাদার, মদন কটকটি, গুড়ের বাতাসা, সাঝ, সরপুরিয়া, সরভাজা, লাবড়ী, লবঙ্গ লতিকা, আর্মিত্তি, নকুল দানা, হাওয়াই মিঠাই, কদমা, বিন্নি ধানের খই, শালকি ধানের মুড়ি। মেলায় এখন বিক্রি হচ্ছে চায়নার পুতুল, রেল গাড়ি, পিস্তল রিভলবার, শটগানসহ সব যান্ত্রিক খেলনা। মেলার পণ্যের বাজার দখল করে নিয়েছে মেশিনে তৈরী নানা ধরনের পণ্য, স্টিল ও প্লাস্টিক সামগ্রী। যাত্রার বিবেক, বেহুলা লঙ্খিনদার পুতুল নাচকে হটিয়ে অর্ধনগ্ন জ্যান্ত পুতুল, লটারি, জুয়া, টাউট, মড়ল মাতব্বর মেলাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

নদী সিকস্তি দক্ষিণাঞ্চলের কপোতাক্ষ, ভৈরব, হরিহর, ভদ্রা, বুড়ি ভৈরব, চিত্রা, মুক্তেশ্বরী, গড়াই, মাথাভাঙ্গাসহ বেশির ভাগ নদীর মৃত্যু হয়েছে। ১৬০০ কিলোমিটার নদী পথ শুকিয়ে গেছে। নদীর মৃত্যুর কারণে মেলারও মৃত্যু হয়েছে। নদীতে স্রোত নেই। বাদাম তোলা নৌকাও নেই। নদীর কিনারের সেই বটবৃক্ষের দেখাও মেলে না। বটবৃক্ষের ছায়ায় আর মেলা বসে না। এত কিছুর পরও চৈত্র সংক্রান্তি আর নববর্ষে দক্ষিণের জনপদে কোথাও কোথাও মেলার সুর বেজে ওঠে।