যশোরে টায়ার রিসোলিং শিল্প একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার
যশোরে প্রস্তুতকৃত রিসোলিং টায়ার

মেধা আর প্রযুক্তির কল্যাণে ফুরিয়ে গেছে গাড়ির ব্লাস্ট হওয়া টায়ার ফেলে দেয়ার দিন। পুরনো ও ফেটে যাওয়া টায়ার রিসোলিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী নতুন টায়ার প্রস্তুত হচ্ছে যশোরে। রি-সোলিং শিল্পের মাধ্যমে এখন ব্লাস্ট টায়ারকে নতুন রূপে ব্যবহার-উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে এ শিল্প। পুরনো আর ব্লাস্ট টায়ারের সমন্বয়ে রিসোলিং শিল্প ক্রমান্বয়ে যশোরে বিকাশ লাভ করছে। স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ও া এ শিল্প একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছে কর্মসংস্থান।

স্বাধীনতার পর রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে গড়ে ও ে প্রথম রি-সোলিং কারখানা। নানা কারণে কয়েক বছর পর কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালের দিকে যশোরে শুরু হওয়া এ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে সারা দেশে গড়ে উ েছে শতাধিক কারখানা। এসব কারখানায় বাতিল এবং ব্লাস্ট টায়ারকে রূপ দেওয়া হচ্ছে নতুনরূপে। দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় এগুলো ব্যবহার করছেন স্থানীয় ট্রাক মালিকরা। পাশাপাশি টায়ারের আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। টায়ার রিসোলিং কাজে কর্মসংস্থান হয়েছে একলক্ষাধিক মানুষের।

নতুন টায়ার কিনতে পরিবহন মালিকদের মোটা অঙ্কের অর্থ গচ্চা দিতে হয়। আর চলন্ত অবস্থায় ফেটে যাওয়া বাস-ট্রাকের টায়ার কোনো কাজে লাগে না কিন্তু রিসোলিংয়ের ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এখন আর সে অবস্থা নেই। মেধা আর স্থানীয় প্রযুক্তিতে বদলে গেছে দৃশ্যপট। পুরনো ও ফেটে যাওয়া টায়ারের সোলের (টায়ারের বাইরের মোটা রাবারের অংশ) সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে ব্যবহার উপযোগী টায়ার। পুরনো টায়ারের ওপর ফেটে যাওয়া টায়ারের সোল সংযোজন করে পাওয়া যাচ্ছে নতুন টায়ার। এতে খরচ কমে যাচ্ছে প্রায় ৮০ শতাংশ। এসব কারখানায় প্রতি মাসে কম-বেশি ৩০ হাজারেরও বেশি টায়ার রি-সোলিং করা হচ্ছে। এতে কয়েকশ' কোটি টাকার দেশীয় মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। ২০০৭ সালে স্থানীয় এ প্রযুক্তির বিষয়টি চিন্তায় আনেন যশোরের মনিহার এলাকার মডার্ন টায়ার হাউসের স্বত্বাধিকারী কাওসার আহমেদ। শুরুর কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সে সময় পুরনো টায়ার ইটভাটা, চাতালসহ বিভিন্ন স্থানে পোড়ানোর কাজে ব্যবহার হতো। আর নতুন টায়ার ফেটে গেলে কোনো কাজে লাগত না। চোরাই পথে ভারতে পাচার হতো। তখন এ দুই ধরনের টায়ারের সমন্বয় সাধনের বিষয়টি মাথায় আসে। স্থানীয় Tyer-প্রযুক্তিতে প্রথমে দুটি বাতিল টায়ারে ফেটে যাওয়া টায়ারের সোল লাগানো হয়। শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকার শামসুদ্দিনের বাসে পরীক্ষামূলক তা সংযোজন করা হয়। সফলতা পাওয়ার পর বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় টায়ার রিসোলিংয়ের কাজ।

পরে এ পদ্ধতি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। একে একে যশোরেই গড়ে ও ে ছোট-বড় ১০টি কারখানা। আর শহরের ঢাকা রোডে রয়েছে এসব টায়ারের অন্তত শতাধিক দোকান। এছাড়া যশোরসহ সারা দেশে শতাধিক কারখানা গড়ে উ েছে। এসব কারখানায় বাতিল টায়ার রিসোলিং করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

কাওসার আহমেদ জানান, একটি নতুন টায়ারের দাম প্রায় ৩০ হাজার টাকা। সেখানে বাতিল টায়ার রিসোলিং করে সর্বোচ্চ ৫-৬ হাজার টাকায় গাড়ির মালিকদের হাতে তুলে দেয়া যাচ্ছে। ফলে অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে ৮০ ভাগ। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হচ্ছে। কারণ নতুন টায়ারের পুরোটাই আমদানি নির্ভর। রিসোলিং করা এ টায়ার নতুন টায়ারের মতোই মজবুত। এ কারণে ক্রেতাদের মধ্যেও এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কম টাকায় ভালো টায়ার পাওয়াই এ চাহিদা বৃদ্ধির কারণ।

কাওসার আহমেদ আরো জানান, স্থানীয় পর্যায়ে টায়ার রিসোলিং শিল্প বিকাশের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য দরকার ব্যাংক ঋণসহ সরকারি সহযোগিতা। পাশাপাশি এর বিকাশে চেম্বারেরও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান জানান, স্থানীয় পর্যায়ে পুরনো টায়ারের এ রিসোলিং কারখানা একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এর প্রসারের জন্য চেম্বার অবশ্যই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ঋণপ্রাপ্তিসহ যেকোনো প্রয়োজনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা প্রয়োজনীয়তা চেম্বারকে অবহিত করা হলে চেম্বার উদ্যোগ নেবে। এ শিল্পের বিকাশে ব্যাংকগুলোকে তিনি এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।