রস-গুড়ে লাখো পরিবারের কর্মসংস্থান যশোরে রস-গুড়ে লাখো পরিবারের কর্মসংস্থানশীত আসলেই যশোরে খেজুর গুড় ও পাটালি তৈরির হিড়িক পরে যায়। চলতি মৌসুমেও এ অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে খেজুর রস ও গুড় উৎপাদন।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় খেজুর গাছ কমলেও টিকে আছে রস-গুড় ও পাটালির জৌলুস। পুরো মৌসুম জুড়ে গাছ কাটা, রস সংগ্রহ, গুড়-পাটালি তৈরি ও বাজারজাতকরণের সাথে ব্যস্ত সময় পার করেন এ অঞ্চলের প্রায় এক লাখ পরিবার।

যশোরের খাজুরা ও ছাতিয়ানতলা এলাকায় সবচেয়ে বেশি গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে এটি অন্যতম লাভজনক কৃষিপণ্য হিসেবে এ অঞ্চলে পরিচিতি পেয়েছে।

যশোরে রস-গুড়ে লাখো পরিবারের কর্মসংস্থানখেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের পর গুড় পাটালি তৈরি করে সংসার চালাচ্ছে এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে যশোরে।

জেলা কৃষি অফিসের হিসাব মতে, যশোরের ৪০ লাখ খেজুর গাছ থেকে সার্বিক খরচ বাবদ গাছিরা (রস সংগ্রহকারী ) মৌসুমে ৪’শ কোটি টাকার বেশি আয় করছে। গাছি, রস সংগ্রহের ভাড় তৈরির কাজ, গাছি দা তৈরি, গাছে উঠতে দা বহন করার জন্য পাত্র (বাঁশের তৈরি ঠুঙ্গি) তৈরির কাজে নিয়োজিত কামার ও মুচি, পরিবহন শ্রমিক এবং পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী সব মিলে লক্ষাধিক পরিবারের কর্মকসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে খেজুর রস-গুড় উৎপাদন খাতে।

কিসমত রাজাপুর এলাকার গাছি ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, "একটি গাছ থেকে মৌসুমে এক থেকে দেড় হাজার টাকার গুড় পাওয়া যায়। যদি কোনো গাছি ৮০টি গাছ রস সংগ্রহের জন্য কাটেন তাহলে তিনি এক মৌসুমে ৮০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো আয় করতে পারেন।"

খাজুরা এলাকার গাছি সিরাজুল ইসলাম বলেন, "মৌসুমে গুড় উৎপাদনে গাছিদের বিনিয়োগ করতে হয় মাত্র দেড় হাজার টাকা। বিনিয়োগ খাতগুলো হলো গাছ তোলা (রস সংগ্রহের জন্য উপযোগী করা), ভাড় (রস সংগ্রহের পাত্র) ও গাছি দা কেনা প্রভৃতি। রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে জ্বালানি কিনতে হয় না। খেজুরের পাতা (স্থানীয় ভাষায় ঝোড় ) দিয়ে জ্বালানির চাহিদা পূরণ হয়।"

যশোরে রস-গুড়ে লাখো পরিবারের কর্মসংস্থানযশোর অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গুড় পাটালির মোকাম খাজুরা হাটের ইজারাদার চয়ন কুমার বসু জানান, সপ্তাহের দুই রোববার ও বৃহস্পতিবার হাট বসে। এসময় হাটে গাছিরা গুড় পাটালি নিয়ে আসে। এছাড়াও এখান থেকে পাইকারী ব্যবসায়ী গুড় পাটালি দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌছে দিচ্ছে।

সারা দেশব্যাপি খাজুরার গুড়-পাটালির চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। যশোরের খেজুর রসের খ্যাতিকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়েছে খাজুরার পাটালি। খাজুরার পাটালির দাম বেশি হওয়া সত্বেও দেশজুড়ে এর কদরও আছে।

অগ্রহায়ণ মাসেই গাছগুলো থেকে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে গাছের পাতাসহ বাকল ধারালো দা দিয়ে পরিস্কার করা হয়। তবে স্থানীয় ভাষায় একে ‘গাছ তোলা’ বলা হয়। এরপর পুনরায় পরিষ্কার করে ৭/৮ দিন পর সেখানে বাঁশের নলি বসানো হয়। এরপর পালা করে সপ্তাহে এক দিন করে প্রতিটি গাছ কাটা হয়। গাছ কাটার দিন যে রস পাওয়া যায় তাকে জিড়ান রস বলে। একটি গাছ একবার কাটলে ছয় লিটারের মতো রস পাওয়া যায়।

তবে শীত এবং আকাশ স্বচ্ছ হওয়ার সাথে সাথে এ রস মিষ্টি ও পরিস্কার হয়। এরপর রস সংগ্রহ করে কয়েক ধাপে গুড় তৈরি করা হয়।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক শেখ হেমায়েত হোসেন জানান, যশোরের উৎপাদিত খেজুরের গুড় এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। প্রতি মৌসুমে এখানকার লক্ষাধিক পরিবার কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে।