যশোর জুড়েই নকসী কাঁথার গ্রাম
পান্থপাড়া গ্রামে নকশীকাঁথা তৈরি করছেন সুঁচ শিল্পীরা।
ফুল, পাখি, নৌকা, হাতি, ঘোড়া, বর-বধূ, পালকি সহ বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত নানা বিষয় সুঁই সুতো দিয়ে নকসী কাঁথায় ফুটিয়ে তুলে যশোরের লক্ষাধিক নারী বাঁচার ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। যশোরের নকসী কাঁথা এখন দেশ জয় করে ইউরোপ আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছে। গ্রামের গরিব অসহায় মহিলা সেলাই কর্মীর পাশাপাশি নকসী কাঁথার বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরাও সাবলম্বী হচ্ছেন।
সরেজমিন খবর নিয়ে জানা যায়, যশোরের ৮টি উপজেলার প্রায় সব গ্রামে এখন নকসী কাঁথা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে যশোর সদরের চাঁচড়া, ভাতুড়িয়া, এড়ান্দা, রহেলাপুর, লেবুতলা, কোদালিয়া, বাহাদুরপুর, হাসিমপুর, কৃষ্ণবাটি, মনোহরপুর, উপশহর চৌগাছা উপজেলার পুড়োপাড়া, জগদিসপুর বাঘারপাড়া উপজেলার পান্থাপাড়া, পার্বতীপুর, জোহরপুর, দেয়াড়া রায়পুর, ঝিকরগাছা উপজেলার হাজিরআলী, বেনেআলী, কৃষ্ণনন্দপুরসহ আরও অনেক গ্রামে নকসী কাঁথা তৈরি হচ্ছে। বে সরকারি হিসাবে যশোরের লক্ষাধিক নারী নকসী কাঁথা তৈরির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। সুঁচি শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৬ হাত বাই সাড়ে ৫ হাত একটি নকসী কাঁথার মজুরী এখন ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা। চার জনের একটি নকসী কাঁথা তৈরিতে এক মাস সময় লাগে। সব মিলিয়ে একটি নকসী কাঁথা তৈরি করতে খরচ হয় ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। কাঁথা ব্যবসায়ীরা এই কাঁথা যশোরে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করে। যশোরের বাইরে এর দাম ৫ হাজার টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা। কাঁথা ব্যবসায়ী, মধ্যস্থতাকারী ও সুঁচি শিল্পী কাঁথা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। কাপড় ও সুতোর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, পাঠান আমলেই যশোর বস্ত্র শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে আজ থেকে ৭ শতধিক বছর আগে যশোরের মহিলাদের হাতে তৈরি নকসী কাঁথা দেশ বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছিল। তিনি লিখেছেন, ‘স্ত্রী লোকরা কাঁথা সেলাই ও সিকা প্রস্তুত করিয়া অন্য দেশকে পরাজিত করে যশোলাভ করিতেন।’ দু’শ’ বছর আগেও যশোরের নকসী কাঁথা তার সুনাম ধরে রেখেছিল এমন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। নকসী কাঁথা মুলত যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে তৈরি হয়। যশোর শহরের চুড়ি পট্টি এলাকার শিক্ষিত যুবক ডিএম শাহীদুজ্জামান ৬ বছর ধরে নকসী কাঁথার কারবারের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিমাসে তিনি শতাধিক মহিলাকে দিয়ে মজুরির ভিত্তিতে গড়ে ২০টি কাঁথা তৈরি করেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা. চট্টগ্রাম, সিলেটে আমার কাঁথা যায়। ইংল্যান্ড, ইটালীতে বেশ কিছু কাঁথা পাঠিয়েছি। হলান্ডে কাঁথা পাঠানোর জন্য নতুন করে চুক্তি হয়েছে। তিনি জানান, কাঁথার বাজারজাতই বড় সমস্যা। বাকিতে বিক্রি করতে হয়। টাকা প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা থেকে যায়।’ শহরের মুজিব সড়কের সাইদুজ্জামান তুষার ৮ বছর ধরে এর সঙ্গে যুক্ত। পুড়োপাড়া, খাজুরা, লেবুতলা, ঝিকরগাছা অঞ্চলে তার ১৬০ জন সেলাই কর্মী রয়েছে। এরাই প্রতিমাসে তুষারকে তার চাহিদা মত ৩০টি কাঁথা তৈরি করে দেয়। তুষার বললেন, ‘একটি কাঁথা তৈরিতে ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। আমরা সেই কাঁথা ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করি। বর্তমানে কাপড় ও সুতোর দাম বেশি বলে কাঁথা তৈরির খরচও বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার যদি বিদেশে কাঁথা রপ্তানির উদ্যোগ নেয় তাহলে আমাদের জন্য তা সোনাই সোহাগা হবে।’ যশোর থেকে ২২ কিলোমিটার দূর বাঘারপাড়া থানার পান্থাপাড়া গ্রাম। এ গ্রামটি নকসী কাঁথার গ্রাম বলে পরিচিত। এ গ্রামের কাঁথার বিশেষ সুনাম রয়েছে। এ গ্রামের জেসমিন বেগম ১৬ বছর ধরে কাঁথা সেলাই করছেন। তিনি বলেন, ‘মন দিয়ে কাঁথা সেলাই করতে হয়। কিন্তু আমাদের পারিশ্রমিক খুব কম। রুবিনা খাতুন ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী। তার বাবা আনিছুর রহমান ৭ বছর আগে মারা গেছেন। রুবিনা ৩ বছর ধরে কাঁথা সেলাই করছে। তার মা রেসমা খাতুনও কাঁথা সেলাই করেন। রুবিনা বলল, ‘কাঁথা সেলাই করে মাসে ৫০০ টাকা আয় হয়। তাতে আমার লেখাপড়ার খরচ চলে। কিন্তু কাঁথা সেলাই করতে গেলে মাথা যন্ত্রণা করে। চোখে ঝাঁপসা দেখি। কাঁথা সেলাইয়ের মজুরি বাড়ানো উচিত।’ এ ব্যাপারে যশোরের মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা কাওসার পারভীন বলেন, ‘যশোরের হাজার হাজার মহিলা নকসী কাঁথা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। আমরাও কিছু প্রশিক্ষণ দিই। এখানকার কাঁথার খুবই সুনাম। জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যশোরের খেজুরের গুড়ের মত নকসী কাঁথাও বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। বাইরে থেকে মেহমান এলে আমরা নকসী কাঁথা উপহার দিই। জেলা পরিষদ সহ আরও কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে সেলাই কর্মীদের নানা ভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’ খ্যাতিমান ফ্যাসান ডিজাইনার বিবি রাসেল বলেন, ‘যশোরের নকসী কাঁথা খুবই সুন্দর। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে মহিলা সুুঁচি শিল্পীরা ধরে রেখেছেন। তাদের সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এগিয়ে আসা উচিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে কাঁথার মান আরও উন্নত করার জন্য তাদেরকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি।’