নিয়াজ পার্ক যশোর শহরের কেন্দ্রস্থলেই বিশাল কালেক্টরেট ভবন। এর উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে পাম গাছের সারি। তারপর বেশ খানিক এলাকা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। পুর্ব-পশ্চিম দীর্ঘ। মাঝখানে বিভিন্ন গাছের সমারোহ। দেখলে মনে হয় একটি পার্ক। পার্কই বটে। নিয়াজ পার্ক। তবে আজকালের মানুষজন এই পার্কটিকে কালেক্টরেট পার্ক হিসাবেই জানে। তারা ভুলে গেছেন নিয়াজ নামটি।
আজকে এটি সাধারন পার্ক। কিন্তু এক সময় এখানে সভা-সমাবেশ হতো। দাবি আদায়ে শ্লোগানে স্লোগানে ভরে উ ত পুরো পার্ক। নতুন প্রজন্মের কেউই জানেন না সে দিনের ইতিহাস। যশোরের এই বর্তমান কালেক্টরেট ভবন নির্মিত হয়েছিল ১৮৮৫ সালে। তখন এটি ছিল এক তলা। অবিভক্ত বাংলার বড় কালেক্টরেট গুলির একটি। এই কালেক্টরেট ভবন ও এর বেশ উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদীর মধ্যবর্তী স্থানটি ছিল ফাঁকা। অবশ্য নদীর তীর ঘেঁষে ছিল একটি সড়ক। এখন যার নাম শহীদ মশিয়ুর রহমান সড়ক। এই সড়ক ও কালেক্টরেট ভবনের মাঝখানেই অবস্থিত পার্কটি।
কে এই নিয়াজ ?
যার নামে পার্কটির নামকরণ, মিঃ এন.এম খান বা নিয়াজ মোহাম্মদ খান ছিলেন যশোরের জেলা প্রশাসক বা ডিস্টিক ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯৩৯ সালে তিনি যশোরে ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটএর দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। এখানে ছিলেন ১৯৪২ সাল পর্যন্ত। নানা কারণে যশোরের মানুষের কাছে তিনি প্রিয় ছিলেন। সে সময় এমনিতেই প্রশাসনে মুসলমানের সংখ্যা ছিল কম। তাও উচ্চ পদে। ১৮৭১ সালে যশোর অবিভক্ত বাংলার প্রথম জেলা হিসাবে মর্যাদা পায়। নিয়াজ মোহাম্মদ খান ছিলেন যশোরের ৭৭তম ডিষ্টিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। তার আগে আর মাত্র তিনজন মুসলমান যশোরে ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন। তারা যশোরে ছিলেন স্বল্প সময়। উত্তর প্রদেশের অধিবাসী নিয়াজ মোহাম্মদ যশোর জেলায় শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যশোরে মিত্র বাহিনীর একটি বিপুল অংশ মজুদ রাখে। তাদের থাকার জন্য বহু শিক্ষা প্রতিষ্ ান রিকুইজিশন করা হয়। কিন্তু এর দরুন যাতে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা ব্যাহত না হয় সে জন্য তিনি বিকল্প ব্যবস্থা নেন। নিয়াজ মোহাম্মদ ছিলেন বৃক্ষ প্রেমিক। তিনি বৃক্ষ রোপণে উৎসাহ দিতেন। কালেক্টরেটের ওই উত্তর দিকের ফাঁকা জায়গায় তিনি বিভিন্ন ফুল এনে লাগানোর ব্যবস্থা করেন। তৈরি করেন সিমেন্টের চেয়ার। ক্রমান্বয়ে তাই এর নাম হয় নিয়াজ পার্ক। কিন্তু তিনি যশোর থেকে বদলী হলে গেলে পরিচর্যার অভাবে ফুল গাছগুলো শুকিয়ে যায়। পার্ক আবার পরিনত হয় সাধারন মা ে। তবে নিয়াজ পার্ক নাম রয়েই যায়। ১৯৪৮ সালে যশোরে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে। সে সময় আন্দোলনকারীদের সভা-সমাবেশের জন্য নিয়াজ পার্ক ছিল নির্ধারিত স্থান। ১৯৪৮ সালের ১২ মার্চ এখানে ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। ৫২,৬২ এবং ৬৯-এর আন্দোলনের সময়ও নিয়াজ পার্ক ব্যবহৃত হয় সমাবেশের জন্য। আন্দোলনকারীরা এখানে সমাবেশের পর স্মারকলিপি দিতেন যশোরের জেলা প্রশাসককে। আর ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পুরো অসহযোগ আন্দোলনকালে নিয়াজ পার্কে অনুষ্ িত হতো সমাবেশ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কুচকাওয়াজ। মোট কথা যশোরের রাজনীতিতে র্দীঘকাল নিয়াজ পার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৮১ সালে যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফজলুর রহমান আবার পার্কটি গড়ে তোলেন। আর মানুষও ভুলে গেছেন নিয়াজ মোহাম্মদের নাম। যার হাতে প্রথম ওই ফাঁকা মা ে রোপিত হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন রকমারি অনেক ফুলের চারা। বর্তমান জেলা প্রশাসক পার্কটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেন।