নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ
নড়াইলে কালিয়া উপজেলা পেড়ালী গ্রামের চিত্রা নীদতে নৌকাবাইচ। ছবি: সংগ্রহ
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী হচ্ছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও ক্রীড়াক্ষেত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐহিত্যকে সমুন্নত রাখার নৌকা বাইচ হচ্ছে একটি মূলধারার ঐতিহ্যবাহী কার্যক্রম এবং এটি হাজার হাজার দর্শক, শুভানুধ্যায়ী, সমর্থক, পৃষ্ পোষক ও খেলোয়াড়দের সমবেত করে। এটি লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। তবে কবে এদেশে গণবিনোদন হিসেবে নৌকাবাইচের প্রচলন হযেছির তার স িক ইতিহাস পাওয়া যায় না। "বাইচ" শব্দটির ব্যুৎপত্তি বিবেচনা করে অনুমিত হয়েছে যে মধ্যযুগের মুসলমান নবাব, সুবেদার, ভূস্বামীরা, যাদের নৌবাহিনী, তারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের সূত্রপাত করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে দুটি জনশ্রুতি আছে। একটি জনশ্রুতি জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে। জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচের শুরু। দ্বিতীয় জনশ্রুতি পীরগাজীকে কেন্দ্র করে। গাজী নদীর ওপারে বসে এ পারের ভক্তকে তার কাছে ডাকছেন। গাজীর আদেশ প্রতিপালন করতে পারছে না ভক্ত, নদীর ভীষণা মূর্তি তাকে নদী পার হতে দিচ্ছে না। তবুও গাজীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভক্ত ছোটে কিন্তু কোনো নৌকা নেই। কে তাকে ওপারে নিয়ে যাবে? অনেক খোঁজ করে একখানা ডিঙ্গি জোগাড় করল ভক্ত। সে নৌকা যতই ওপারের দিকে যেতে চেষ্টা করে ততই স্ফীতদোর হয়ে ও ে নদী। একপর্যায়ে নৌকা ডুবে যায়। নৌকার দুর্দশা দেখে একে একে অনেক লোক ছুটে বিপদগ্রস্ত ডিঙ্গির মাঝি, যাত্রী ও নৌকাকে সাহায্য করতে। সবাই গাজীর চরণে প্রণাম করে, গাজীর নাম নিতে নিতে এগিয়ে চলল। নদী ক্রমেই শান্ত হয়ে এলো। ভক্ত নদীর ওপারে পৌঁছাল। শান্ত নদীতে নৌকার সারি মনের প্রশান্তিতে তখন একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে চলল। এই পাল্লার নেশা থেকেই নাকি নৌকা দৌড়ের বা বাইচের উৎপত্তি।

বাইচের নৌকা
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকা দেখা যায়। বাইচের নৌকার গ ন কিছুটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। লম্বায় যেমন অনেক দঘল ; িক তেমনই চওড়ায় খুবই সরু। কারণ সরু ও লম্বাটে হওয়ার দরুন নদীর পানি কেটে দরতরিয়ে দ্রুত চলতে সক্ষম এবং প্রতিযোগিতার উপযোগী। নৌকার সামনের গলুইটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। তাতে কখনো করা হয় ময়ূরের মুখ, কখনো রাজহাঁস বা অন্য কোনো পাখীর মুখাবয়ব। নৌকাটিতে উজ্জ্বল রঙের কারুকাজ করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। সর্বোপরি নৌকাটিকে দর্শকের সামনে যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা থাকে।
বাইচে অংশগ্রহণ
উপযুক্ত নৌকায় দু’পাশে মাঝিরা সার বেধে বসে পড়ে বৈ া হাতে। মাঝিদের বৈ া টানাকে সুষ্ ুভাবে পরিচালনা করার জন্য একজন পরিচালক থাকে যাকে বলা হয় গায়েন। সে বসবে নৌকার গলুই-এ।। মাঝিরা একত্রে জয়ধ্বনি সহকারে নৌকা ছেড়ে দিয়েই এক সাথে কোনো একটি গান গাইতে আরম্ভ করে এবং সেই গানের তালের ঝোঁকে ঝোঁকে বৈ া টানে ; যার ফলে কারও বৈ া োকা ুকি না-লেগে এক সাথে পানিতে অভিঘাত সৃষ্টি করতে থাকে। গায়েন বা পরিচালক কাঁসির শব্দে এই বৈ ার এবং গানের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্য সব নৌকাকে পেছনে ফেলে নিজেদের নৌকাকে সবার আগে যাওয়ার চেষ্টায় প্রয়োজন বোধে কাঁসির শব্দে বৈ ার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয় এবং সেই সাথে গানের গতিও বেড়ে চলে। এ ছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যে 'হৈ, হৈয়া" এই ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এটি সারি গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

নড়াইলের কয়েকটি স্থানে নৌকাবাইচ অনুষ্ িত হয় এর মধ্যে প্রতিবছর বরেণ্য চিত্র শিল্পী এস এম সুলতানের জন্মোৎসব উপলক্ষে নড়াইলের চিত্রা নদীতে নৌকাবাইচের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সুলতান উৎসব। সুলতান ফাউন্ডেশরে উদ্দ্যেগে এ প্রতিযোগিতার চিত্রা নদীতে মহিলা ও পুরুষের অংশগ্রহনে এই নৌকাবাইচ অনুষ্ িত হয়। নড়াইল ফেরিঘাঁট থেকে শিল্পী এস এম সুলতান ব্রিজ পর্যন্ত ২ কিলোমিটার পর্যন্ত নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ িত হয়।
আর নড়াইলের কালিয়া উপজেলার খড়রিয়ায় চিত্রা নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ িত হয়েছে। খড়রিয়া যুব সংঘ এ প্রতিযোগিতা আয়োজেন করে । তারাপুর মোড় থেকে খড়রিয়া বাজার পর্যন্ত নদীর দু’পাড়ে হাজার হাজার মানুষ এই নৌকাবাইচ উপভোগ করেন। নৌকা বাইচ চলাকালে সারিগান গান আরো উৎসবমুখর করে তোলে।
এছাড়া প্রতি বছর সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বকর্মা পূজার দিনে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বকর্মা পূঁজা উপলক্ষে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেড়লী গ্রামে চিত্রা নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ িত হয়। পেড়লী বাজার বনিক সমিতি এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। স্থানীয় খানকা শরীফ মোড় থেকে ত্রিমোহনা মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার দীর্ঘ হয় এই প্রতিযোগিতা।
ঐতিহ্যবাহী এইসব নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নৌকা অংশগ্রহণ করে। নয়নাভিরাম এই বাইচ দেখতে স্থানীয় ছাড়াও বিভিন্ন জেলার হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুরা নদীর দু’পাড়ে ভিড় করেন এবং এক পর্যায়ে তা জনসমূদ্রে রূপ নেয়। নদীর দু’পাড় ছাড়াও বিভিন্ন ভবনের ছাঁদে অবস্থান নিয়ে অসংখ্য মানুষ নৌকাবাইচ উপভোগ করেন। আবার অসংখ্য দর্শক নৌকা ও ট্রলারে চড়ে হরেক বাদ্যযন্ত্র বাঁজিয়ে বাইচে অংশ নেয়া নৌকার মাঝিদেরকে উৎসাহ দিতে থাকেন। নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে শতাধিক দোকানী হরেক রকম পণ্যের পসরা সাঁজিয়ে বসে এবং তা গ্রাম্য মেলায় রূপ নেয়। এ নৌকা বাইচ পরিণত হয় মিলন মেলায়।