জামতলার রসগোল্লা বা সাদেক গোল্লা
যশোর, জামতলার রশগোল্লা

জামতলার রসগোল্লার আসল নাম সাদেক গোল্লা। এই সাদেক গোল্লা এখন জামতলার মিষ্টি হিসেবে দেশ-বিদেশে সমাদৃত। প্রতিদিন শত শত জামতলার মিষ্টি তৈরি হচ্ছে; কিন্তু দুপুরের আগেই তা ফুরিয়ে যাচ্ছে। যশোরের শার্শা উপজেলার জামতলার এই রসগোল্লা দীর্ঘ ৫৫ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার ছোঁয়া জামতলার রসগোল্লার ওপর পড়লে দিনে লাখ টাকার মিষ্টি বিক্রি হওয়া কঠিন কিছু নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের ছোট বাজার জামতলা। যশোর থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে। শুধু রসগোল্লার কারণে দেশ-বিদেশে জামতলার নাম ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বেশিরভাগ প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট জামতলার মিষ্টি খেয়েছেন। বিদেশি অতিথিরাও জামতলার মিষ্টি খেয়ে প্রশংসা করেছেন। কিন্তু জামতলার মিষ্টি শুধু জামতলায়ই তৈরি হয়। বিদেশের বাঙালিরা এই মিষ্টি তৈরির চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশি গরুর দুধ, উন্নত মানের চিনি আর জ্বালানী হিসেবে এক নম্বর কাঠ এই মিষ্টি তৈরির মূল উপাদান। এর বাইরে কী মন্ত্র আছে, তা জানা যায়নি।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৫৫ সালে চায়ের দোকানদার মরহুম শেখ সাদেক আলী প্রথম এই মিষ্টি তৈরি শুরু করেন। সাদেক আলীর একটি চায়ের দোকান ছিল। প্রতিদিন গোয়ালরা দোকানে গরুর দুধ দিয়ে যেত। একদিন দুধের পরিমাণ বেশি হলে সাদেক দুধ কিনতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। এ সময় কুমিল্লা থেকে আসা এক ব্যক্তি সাদেককে জানান, দুধের মান খুব ভালো। তুমি দুধ রেখে দাও। আমি রাতে মিষ্টি তৈরি করে দেব। সেই দুধে মিষ্টি তৈরি শুরু। কুমিল্লার সেই ব্যক্তির কাছ থেকে শিখে সাদেক মিষ্টি তৈরি শুরু করেন। মিষ্টির গুণাগুণের জন্য একপর্যায়ে সেই রসগোল্লার নাম হয় সাদেক গোল্লা। সেই ১৯৫৫ থেকে ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাদেক নিজ হাতে মিষ্টি তৈরি করে এর সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছেন। সাদেকের মৃত্যুর পর তাঁর পাঁচ ছেলে আনোয়ার হোসেন, আলমগীর, শাহজাহান, নূরুজ্জামান ও জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ের হাল ধরেন। এখন সাদেকের জামতলায় দুইটি দোকান রয়েছে। জামতলা বাসস্ট্যান্ডের বটতলায় একটি দোকান। এটার নাম 'সাদেক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার'।

এই দোকানে শুধু সাদেক গোল্লা বিক্রি হয়। দোকানটিতে রসগোল্লা ছাড়াও সব ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়। প্রতিদিন শত শত মিষ্টি এখানে বিক্রি হয়। প্রতিটির দাম ৫ ও ১০ টাকা। পলিথিনের প্যাকেটে ৫ টাকা দামের ১০টি, আর ১০ টাকা দামের পাঁচটি মিষ্টি ৫০ টাকা দামে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি হচ্ছে। সাদেকের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও নূরুজ্জামান আসল জামতলার 'সাদেক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার' পরিচালনা করছেন। তারা আরো জানান, জামতলা ছাড়া আমাদের আর কোথাও মিষ্টির দোকান নেই। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামতলার মিষ্টি বলে যে মিষ্টি তৈরি হচ্ছে, তা সবই নকল। মিষ্টির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাঁরা জানান, হালকা মিষ্টি। স্পঞ্জ রসগোল্লা, বাদামি রং। মূল বিষয় হচ্ছে, এই মিষ্টি দেশি গরুর দুধ দিয়ে তৈরি। ভালো চিনি এবং তেঁতুল, বাবলা বা বেলকাঠের জ্বাল ছাড়া আর কোনো মন্ত্র নেই। জাহাঙ্গীর আলম জানান, ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনা যশোরে এলে আমাদের এখান থেকে সেনাবাহিনী মিষ্টি নিয়ে গেছে। হাসিনা, খালেদা ও এরশাদসহ বিদেশি রাষ্ট্রীয় মেহমানরা আমাদের মিষ্টি খেয়েছেন। আমেরিকা, দুবাই, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ভারত, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও জাপানে অনেকেই এখান থেকে মিষ্টি কিনে নিয়ে যান। তাদের ভাষ্য, চুলা ও পাত্র অন্যত্র নিয়ে গেলে এই মিষ্টির স্বাদ থাকবে না। তিনি আরো জানান, সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠ পোষকতা পেলে এখন আমরা জামতলার মিষ্টির একটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারি।