যশোরের চিরুনি শিল্প যশোর নামের সাথে জড়িয়ে ছিলো চিরুনির ঐতিহ্য। বঙ্গ ললনাদের মেঘবরণ চুলোর কেশ চর্চায় অপ্রতিদ্বন্দী ছিলো যশোরের চিরুনি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এক সময় এই চিরুনির সাড়া জাগানো সুনাম ছিলো অখন্ড ভারত উপমাদেশ জুড়ে। সে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল শ্রীলংকা, মিশরসহ সমগ্র আরব দেশে। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে যশোরের চিরুনি অর্জন করেছে স্বর্ণপদক। বলতে গেলে উপমহাদেশের বাজার তখন ঝুঁকে পড়েছিলো যশোরের চিরুনির দিকে।

বৃটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জনকে উপহার দেয়া হয়েছিল যশোরের চিরুনি। বড়ই প্রীত হয়েছিলেন তিনি। ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ তাঁর মেয়ের নামে চিরুনির নামকরণ করা হয়েছিলো ‘ইকলিস’। চিরুনি উপহার দেয়া হয়েছিলো তৎকালিন ইরাকের প্রেসিডেন্ট জনাব আরিফকে। দেয়া হয়েছিলো ইরান, রাশিয়া, জাপান, ইতালী, বৃটেন ও তুরস্কের রাষ্ট্রদূতদের। তাঁর সকলে এর উচ্ছসিত পশংসা করেছিলেন।

১৯৮২ সালে খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এসেছিলেন যশেরের চিরুনি শিল্প পরিদর্শনে। সন্তুষ্ট হয়ে তিনি অভিজ্ঞান পত্র দিয়েছিলেন। শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরুপ তাকেও চিরুনি উপহার দেওয়া হয়েছিলো। এই শিল্প পরিদর্শনে ১৯৫৯ সালে রাশিয়া, ১৯৬২ সালে সুইডেন, বৃটেন ও ইরান, ১৯৭০ সালে ইতালী, ১৯৭৬ সালে পোল্যন্ড প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রদূতগণ এসেছিলেন। এছাড়াও পরিদর্শনে এসেছিলেন জাপানের কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা এবং বহু দেশি-বিদেশি গন্যমান্য ব্যক্তি।

কিন্তু সেই ঐতিহ্যবাহী সেই যশোরের চিরুনি শিল্প আজ হারিয়ে গেছে। হাজারো রকমের সমস্যর কারনে এক সময় বন্ধ হয়েযায় চিরুনি কল গুলো।
চিরুনির কাঁচামাল তথা সেলুলয়েডের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং চোরাপথে আনা ভারতীয় চিরুনি এই শিল্পের নড়বড়ে ভিতকে আরো নড়িয়ে দেয়।

শুরুর কথা:
১৯০১ সালে ‘কম্বস এন্ড সেলুলয়েড ওয়ার্কস’ নাম দিয়ে চিরুনি শিল্পের যাত্রা শুরু মাত্র ৪০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে। প্রতিষ্ঠান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্রী কিরণ দত্ত, মন্মথ বাবু এবং শ্রী মিত্র। এদের মধ্যে মন্মথ বাবু চিরুনি শিল্পে জাপান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পরবর্তী কালে বৃটিশ ও পাকিস্থান আমল মিলিয়ে আরো তিনটি চিরুনি কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলো হলো: যশোর কম্ব ওয়ার্কস’, যশোর কম্ব এন্ড নভেলটি ওয়ার্কস, শফি যশোর কম্ব ফ্যাক্টরি’। ১৯৭২ সালে ‘মিতা যশোর কম্ব ফ্যাক্টরী নামে আরো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
প্রিতষ্ঠার লগ্ন থেকে যশোরের চিরুনির সুনাম আস্তে আস্তে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তবে ১৯৩০ সালে থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ‘কম্বস এন্ড সেলুলয়েড ওয়ার্কস’ এর তৈরি চিরুনির চাহিদা ছিলো সর্বাধিক। তখন দৈনিক পঁচিশ হাজার চিরুনি এই কারখানায় তৈরি হতো। এই সময়ে মহীশূর, কোলকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বে, হায়দরাবাদ, কানপুর, লাহোর, দিল্লী, করাচী, লাক্ষ্ণৌ, আহমেদাবাদ, মিরাট, পুনে, বরোদা, পাটনা সহ বলতে গেলে প্রায় সারা ভারত জুড়েই চলতে থাকে প্রদর্শনী। আসতে থাকে একেরপর এক স্বর্ণপদক। বিদেশের বাজারও তখন যশোরের চিরুনির জন্য ছিলো উদ্গ্রীব।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর শ্রী কিরণ দত্ত, মন্মথ বাবু ও শ্রী মিত্র ভারতে চলে যান। ফলে যশোরের চিরুনি শিল্প প্রথমবারের মতো অনিশ্চয়তার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। তখন এম এম আলমগীর, জে. এম আকবর ও শেখ সফিউদ্দিন এই তিনজন পর্যয়ক্রমে চিরুনি শিল্পের হাল ধরেন। ফলে সাময়িক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।

শিল্পধ্বসের কারণ:
১৯৫৮ সাল পর্যন্ত যশোরের চিরুনি শিল্পের পথ পরিক্রম ছিলো নিরাপদ। এ সময় পর্যন্ত চিরুনি তৈরির কাঁচামাল সেলুলয়েডের উপর কোন আমদানি কর ছিলো না। ১৯৫৯ সালে প্রথমবারের মতো এর উপর কর আরোপিত হয়। সেই সময় চিরুনি শিল্প পড়ে হুমকির মুখে। পাকিস্থান আমলের শেষ নাগাদ এই করের হার দাড়ায় শতকরা ৬০ ভাগ। এবং বাংলাদেশ আমলে এই করের হার দ্বিগুন হয়ে শতকরা ১২০ ভাগে দাড়ায়। ১৯৭৭ সালে তা কমিয়ে ৭৫ ভাগে আনা হলো। কিন্তু তৈরি সমগ্রীর উপরে ১০ ভাগ নতুন কর বসানো হলো। এর উপরে এলো আবগারি শুল্ক। ১৯৮০ সালে আমদানি কর বেড়ে দাড়ালো ১০০ ভাগ। ভলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়লো দ্রুত লয়ে। ব্যাহত হতে থাকলো উৎপাদন।

যশোরের চিরুনি শিল্পের ধ্বসের অন্যতম কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে সেলুলয়েডের অসম্ভব রকম মূল্য বৃদ্ধি। পাকিস্থান আমলে এক কিলোগ্রাম সেলুলয়েডের মূল্য ছিলো মাত্র ১০ টাকা। বাড়তে বাড়তে ১৯৮০ সালে তার মূল্য দাড়ায় ২০০ টাকায়। এর উপরে রয়েছে উৎপাদন খরচ, ব্যাকের সুদ, বিক্রয় কর, আমদানি কর, আবগারি শুল্ক প্রভৃতির ধাক্কা। এই অস্বাভাবিক চারেপ মুখে প্রতিষ্ঠান গুলো একের পর এক বন্ধ হতে থাকে।
পাকিস্থান আমলে এক ডজন চিরুনির দাম ছিলো ২০ থেকে ৩০ টাকা। সেই চিরুনি ১৯৭৬ সালে ছিলো ডজন প্রতি ১০০ টাকা, ১৯৭৭ সালে ১৫০ টাকা, ১৯৮০ সালে ২০০ টাকা এবং পরবর্তীতে ২৫০ টাকায় ফলে সাধারণ মানুষের এটি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সেই তুলনায় ভারতীয় চিরুনির দাম প্রায় অর্ধেক। ফলে যশোরের চিরুনি প্রতিযোগিতায় মার খেতে থাকে। পশ্চিম বাংলার বনগাঁ হচ্ছে ভারতের চিরুনি শিল্পের পীঠ স্থান। দেশত্যাগী যশোরের চিরুনি নির্মাতারা ভারতের বনগাঁয় এই শিল্প গড়ে তোলে। এবং প্রসার ঘটতে ঘটতে সেখানে ২৫০ টির বেশি কারখানা গড়ে ওঠে। এবং সহজেই বিপুল পরিমান চিরুনি রাতের আঁধারে সীমান্ত অতিক্রম করে চোরাচালানিদের ম্যাধ্যমে যশোর সহ বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায় যশোরের চিরুনি শিল্প।
যশোরে হাড়ের চিরুনি:
বলা হয়ে থাকে, যশোরের হাড়ের চিরুনি পৃথিবী খ্যাত। প্রকৃত পক্ষে হাড়ের চিরুনি যশোরে কোন দিনও তৈরি হতো না। জানা যায়, ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত মহিষের সিং থেকে চমৎকার চিরুনি তৈরি হতো। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারত থেকে মহিষের সিং আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে শুধু সেলুলয়েডের চিরুনীই যশোরে তৈরি হয়। আমাদের দেশের মহিষের সিং উন্নতমানের না হওয়ায় এবং এ থেকে উন্নত মানের চিরুনি তৈরি না হওয়ায় সিং থেকে চিরুনি তৈরিতে ভাটা পড়ে।

যেভাবে তৈরি হতো চিরুনি:
হাতে অথবা মেশিনে দু’ভাবে চিরুনি তৈরি করা যায়। এর মান নির্ভর করে সম্পূর্ণ কারিগরের দক্ষতার উপর। প্রথমে সেলুলয়েড সিট ডিজাইন মতো কেটে নেওয়া হতো। এরপর এগুলো ফালি করে এগুলো চিরুনির আকারে আনা হতো। ফালি করার কায়দা এবং দক্ষতার উপর নির্ভর করে চিরুনির রং। এক এক ভাবে ফালি করলে এক এক ধরনের রং বের হতো। এরপর পালিশ করে মসৃণতা এবং রঙের উজ্জ্বলতা আনা হতো। তখন দাঁত ফিনিসিং করলে তৈরি হতো সুদৃশ্য চিরুনি। চিরুনি ফ্যাক্টিরির জন্য যন্ত্রপাতি লাগতো সামন্যই। কাটিং, এবং দাঁত কাট মেশিন যা যে কোন রকম লেদ ওয়ার্কশপ থেকে তৈরি করা যেত। যশোর ছাড়া এধরনের চিরুনি আরো দুইটি কারখানা ছিলো ‘জেসকো কম্ব ফ্যাক্টরি’ নামে খুলনাতে এবং অন্যটি ‘ডাকো কম্ব ফ্যাক্টরি’ নামে ঢাকাতে। ঢাকার কারখানাটি ১৯৭২ সালে এবং খুলনারটি ১৯৭৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
যশোরের তিনটি চিরুনি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘যশোর কম্ব এন্ড নভেলটি ওয়ার্কস’ এর ট্রেডমার্ক ছিলো ‘করিম যশোর’, ‘শফি যশোর কম্ব ফ্যাক্টরি’ ট্রেড মার্ক, ‘শফি যশোর, এবং মিতা কম্ব ফ্যাক্টরির ট্রেডমার্ক ‘মিতা যশোর’ হিসাবে ব্যবহার করা হতো। এই তিনটি ছাড়া সমস্ত চিরুনিতে ‘যশোর’ সীল যুক্ত থাকলেও তা প্রকৃতপক্ষে ছিলো ভারতের তৈরি। এগুলোর মধ্যে সুলতান যশোর, ম্যাটাডোর যশোর, ঈশান যশোর, মডার্ন যশোর, ইস্টার্ণ যশোর, চক্র যশোর, শংকর যশোর প্রভৃতি নামের চিরুনি পাওয়া যেত।