কেশবপুরের কালোমুখ হনুমান
যশোর, কেশবপুর, কালোমুখো হুনুমান, হুনুমান
কেশবপুর থানার মোড়ে একদল হনুমান খেলা করছিল। পাশের এক দোকানী একটি হনুমানের লেজ কেটে দেয়। হনুমানরা দল বেঁধে কাটা লেজটি নিয়ে চলে যায় থানার ভেতর। থানার ডিউটি অফিসারের সামনে গিয়ে হনুমান গুলো চিৎকার শুরু করে দেয়। থানার ডিউটি অফিসারের দিকে হাতজোড় করে নিবেদন করে-এর বিচার চাই। অভিযোগ তাদের এক সতীর্থের লেজ কেটে দিয়েছে মানুষরূপী এক দানব। পুলিশ এসে ওই দোকানীকে ধরার চেস্টা করে। পালিয়ে যায় সেই দোকানী। কিন্তু হনুমান আর থানা থেকে বের হয় না। পরে ওসি এসে হনুমানদের খাবার দেয়। এরপর হনুমান গুলো থানা থেকে চলে যায়। কয়েক বছর আগে সত্যি সত্যি এমন ঘটনা ঘটে কেশবপুরে। বিরল প্রজাতির কেশবপুরের কালোমুখ হনুমান গুলো এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ঠিকমতো খেতে পারছে না তারা। সরকার তাদের খাবারের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করলেও তারা ঠিকমতো খাবার দেয়না বলে অভিযোগ। ফলে খাবার না পেয়ে এখন তারা বাসা বাড়িতে হানা দিচ্ছে।

কেশবপুরের কালোমুখ হনুমান:
এই হনুমান গুলোর ইংরেজি নাম কমনলেঙ্গুর। বাংলাদেশে এ প্রজাতির হনুমান প্রায় বিলুপ্তির পথে। শুধু কেশবপুর সদর এলাকা, ব্রক্ষকাঠি, রামচন্দ্রপুর, বালিয়াডাঙ্গা এবং পার্শ্ববর্তী মনিরামপুরের দুর্গাপুর গ্রামে এই হনুমান দেখা যায়। বর্তমানে এদের সংখ্যা প্রায় ৫শ। কত আগে থেকে কেশবপুর এই হনুমান গুলো বসবাস করছে? এর কোন সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারেনি। তবে প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, তারা ছোট বেলা থেকে দেখে আসছে এই এলাকায় কালোমুখ হনুমান রয়েছে। তবে আগে এদের সংখ্যা বেশি ছিল। এরা কেশবপুর বাজার এবং তার আশে পাশে ছাড়া অন্যস্থানে গিয়ে থাকতে পারে না। কেশবপুরের কেউ কেউ চেস্টা করেছিলেন, এদেরকে সাগড়দাড়িতে রাখতে। মধু কবির বাড়ি সাগরদাড়িতে প্রতিদিন শত শত মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে বেড়াতে আসেন। সেখানে হনুমান গুলো থাকলে হয়তো কিছু খাবার তারা পেত। কিন্তু কেশবপুর ছেড়ে হনুমান গুলো কোথাও যেতে চায় না। সে কারণে সাগড়দাড়িতে কিছু হনুমান রেখে এলেও তারা আবার ফিরে এসেছে কেশবপুর।
এরা ছোট ছোট দল বেঁধে চলাচল করে। দলের নেতৃত্ব দেয় বয়স্ক হনুমান। সারা দিন চষে বেড়ায় এই সব এলাকার বাগান এবং বাসা বাড়ি। এক সময় কেশবপুর এলাকায় প্রচুর বন জঙ্গল ছিল। ফলে তারা সেখানে রাত্রি যাপন করতো। কিন্তু বর্তমানে তা না থাকায় তারা বাসা বাড়ি এবং সরকারী অফিস গুলোতে আশ্রয় নেয়। অস্তিত্ব রক্ষার তাগিতে এরা চলে আসে লোকালয়ে। প্রজনন প্রক্রিয়া হতে থাকে ব্যাহত। খাদ্যের খোঁজে গিয়ে মারা যেতে থাকে হনুমান গুলো। কেশবপুরের এ হনুমান গুলোর দলীয় শৃঙ্খলা প্রবল। সাধারনত এরা মানুষকে আক্রমন করে না। তবে খাদ্যের অভাব হলে তারা সবজি কিংবা ফলের বাগানে নেমে পড়ে। কেউ মারতে গেলে এরা সাধারন মানুষের মতো হাতজোড় করে মাপ চায়। আবার দলের কেউ অন্যায় ভাবে নির্যাতিত হলে সকলে দল বেঁেধ গিয়ে তার বাড়ির দরজায় বসে থাকে। যেহেতু প্রাকৃতিক ভাবে খাদ্য কমে গেছে, তাই তারা বাগানে, ক্ষেতে গিয়ে খাদ্য খাচ্ছে।

হনুমান রক্ষায় সরকারী তৎপরতা:
বিপন্ন এই হনুমানদের রক্ষায় এগিয়ে আসে প্রভার্টি ইলিমিনেশন এ্যাসিষ্ট্যান্স ফর এভরি হয়ার। সংক্ষেপে নাম ‌‌পিস‌‌‍‍। পরিবেশ ও মন্ত্রানালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে কেশবপুরের বিপুপ্ত প্রায় প্রজাতির হনুমান সংরক্ষণ ও পরিচর্যা নামের পাঁচ বছরের একটি প্রকল্প গ্রহন করে। প্রতিদিন কেশবপুর এলাকার ৫টি পয়েন্টে হনুমানদের জন্য কলা, বেগুনসহ অন্যান্য খাবার দেয়া হতো। এর জন্য কেশবপুরে এক জন প্রকল্প সমন্বয়কারী নিয়োগ দেয়া হয়। ওই প্রকল্প শেষ হয়েছে বেশ আগে। এখন বন ও পরিবেমন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের অধিনে সেখানে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। আগের প্রকল্পে প্রতিদিন হনুমানদের জন্য ২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও বর্তমান প্রকল্পে মাত্র ৯শ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই সামান্য টাকা দিয়ে ৫শ হনুমানের খাবার সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তারপরও অভিযোগ পুরো টাকার প্রতিদিন খাবার দেয়া হয়না। যশোর অঞ্চলে জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের অধীনে কিছু ফলজ গাছ লাগানো হয়েছে কেশবপুরে। ওই সব গাছের ফল খাবে হনুমান। কিন্তু ওই গাছ বড় হতে এখনও অনেক দেরি। স্থানীয় মানুষ বলেন, ফলজ বৃক্ষের পাশাপাশি সরকারী খাস জমিতে সরকার যদি কলা গাছ লাগাত তা হলে হনুমানের খাবার সংকট কমে যেত। কিন্তু তা লাগানো হয়নি। সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম কেশবপুরে এক অনুষ্ঠানে ঘোষনা দিয়েছিলেন, বিরল প্রজাতির হনুমান গুলো রক্ষার জন্য এই এলাকায় অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হবে। কিন্তু বন বিভাগ থেকে কিছু ফলজ বৃক্ষ লাগানো ছাড়া আর কোন কাজ হয়নি সেখানে।

খাদ্য সংকট: বিলুপ্ত হয়ে যাবে কি কেশবপুরের হনুমান:
বর্তমানে হনুমানরা তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে। কয়েক দিন আগে কেশবপুর বাজারে এক ব্যক্তি বাজার করতে আসনে। কেশবপুর সরকারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে পৌঁছালে এক বড় হনুমান তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে টাকা বের করে নিয়ে পাশের দোকানে চলে যায় হনুমান। দোকানী তাকে একটি পাউরুটি এবং ১টি কলা দেয়। আর হনুমান ১০ টাকার নোটটি দোকানে রেখে আসে। এ রকম ঘটনা কেশবপুরে অহরহ ঘটছে। খাদ্যের সন্ধানে হনুমান গুলো এখন বাসা বাড়িতে হানা দিচ্ছে। এছাড়া বাজারে আসা মানুষের হাতে প্যাকেট দেখলেই তা কেড়ে নিচ্ছে। দোকান গুলোতে কলা, পাউরুটি, বিস্কুট বিক্রি করতে পারছেন না দোকানীরা। ভাতের হাড়ি দেখতে পেলেই তার ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিচ্ছে। যে এলাকায় হনুমান গুলো থাকে সেখানে গাছের পেয়ারা, আম, আমড়া, কলাসহ নানা ধরনের ফল তারা খেয়ে নেয়। তারপরও কেশবপুরের মানুষ হনুমানের অত্যাচার সহ্য করেন। কারণ এরা যে এলাকায় বেশি থাকে, সেই এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত। তারা হনুমানকে কোন দিন আঘাত করে না। তবে স¤প্রতি সময়ে চোরাকারবারীরা এই হনুমান গুলো এখান থেকে চুরি করে অন্য স্থানে নিয়ে বিক্রি করছে এমন অভিযোগ রয়েছে। এটা এতো গোপনে করা হয় যেন কেউ টের পাননা। তারপরও কয়েক বছর আগে হনুমান পাচারের সময় স্থানীয় মানুষের হাতে দুই জন চোরাকারবারী আটক হয়েছিল। কিন্তু থানায় মামলা হয়নি। এছাড়া প্রতি বছর হনুমান মারা যাচ্ছে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে। কেশবপুরের মানুষের দাবি শহর এলাকায় বিদ্যুতের কভার দেয়া তার সরবরাহ করা হোক। তাহলে হনুমান গুলো মারা যাবে না। কিন্তু সেই দাবি মানেনি পল্লী বিদ্যুত। তাদের কাছে এই হনুমানের কোন মূল্য নেই।